লেখায় ছবি, না ছবিতে লেখা?

 

day1_session3

কথায় বলে,বেশভূষা-ই হল মহিলাদের অহংকার। আর ভাষাকে আমরা মাতৃরূপে দেখতে অভ্যস্ত, এবং অলংকরণকে লেখার বেশভূষা বলাই যায়। মহিলাদের অহংকার নিয়ে আর বিতর্কে না গিয়ে আমরা এটুকু নিশ্চিতভাবে বলতেই পারি যে ‘লেখায় অলংকরণের কি প্রয়োজন?’, প্রশ্নটির উত্তর নিয়ে কারুর মনে কোনও দ্বিধা নেই। তাই আমাদের আজকের দ্বিতীয় অধিবেশনের আলোচ্য বিষয় – “লেখায় অলংকরণের কী প্রয়োজন?”

আলোচনায় আমাদের সাথে ছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়, কার্টুনিস্ট এবং অঙ্কনশিল্পী অনুপ রায়, প্রচ্ছদশিল্পী তথা বাংলা সংবাদপত্রের অফসেট প্রিন্টিং জগতের দিগ্বিজয়ী ব্যক্তিত্ব দেবব্রত ঘোষ এবং তিন দশক ধরে এশিয়াটিক সোসাইটির প্রকাশনার দায়িত্বে থাকা ও লিপি রহস্য, ভাস্কো দ্য গামার ভারত-খ্যাত নির্বেদ রায়। অধিবেশন সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন সাংবাদিক ও অধুনা বাংলা উপন্যাস জগতে পরিচিত নাম প্রচেত গুপ্ত।

প্রথম প্রশ্নটি ,আমার মতে খানিক বাহুল্য মনে হলেও আমাদের অধিবেশন শুরু হল সেই প্রশ্নটি দিয়ে, “অলংকরণের আদৌ কোনও প্রয়োজন আছে কি?” এবং, প্রত্যেকেই একমত হলেন এই বিষয়ে যে লেখায় অলংকরণ অপরিহার্য। উপরন্তু, সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায় এটাও বললেন যে একজন শিল্পীর নিজের বিকাশের জন্যও অলংকরণ খুবই প্রয়োজনীয়।

দেবব্রত ঘোষ বললেন যে শিশুদের বইতে, বা তরুণ পাঠককে বইয়ের দিকে টেনে আনার ক্ষেত্রে অলংকরণ এক বিশাল আকার নেয়। তাঁর মতে, লেখায় ছবি শিশুদের খানিকটা হলেও লেখকের মনের অন্তরে এবং লেখককে তাঁর পাঠকের মনের অন্তরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। সাথে সাথে তিনি এও বলেন যে তিনি নিজে বড়দের উপন্যাসে অলংকরণের বিশেষ পক্ষপাতী না হলেও, তিনি তাঁর পাঠকদের কাছে এই রকম রিকোয়েস্ট পাচ্ছেন।
                  dsc_1418

 

ইতিহাসবিদ নির্বেদ রায় আমাদের আলোচনার বিষয়কে অনেক বড় ব্যাপ্তি দিলেন। তাঁর কথায়, অলংকরণের অস্তিত্ব শুধুমাত্র লেখাকে ফুটিয়ে তোলা নয়, বরং মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ পাওয়া যায় যেখানে ছবিটা নিজেই একটা গল্প হয়ে উঠেছে। সারা বিশ্ব জুড়ে তিনি সিসটাইন চ্যাপেল থেকে শুরু করে আনাতোলিয়ার গুহার দেওয়ালে আঁকা বাইসনের ছবির কথা উল্লেখ করে বলেন যে সেগুলি কোনও অংশেই সাহিত্যের চেয়ে কম নয়।
dsc_0638

 শিল্পী অনুপ রায় কিংবদন্তী লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উদাহরণ দিয়ে  বলেন যে ঠিক যেমন অঙ্কনশিল্পী-রা লেখককে দেখে তাঁদের কাজ সমৃদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ হন, ঠিক একইরকম ভাবে অনেক সময় লেখকরাও অলংকরণ দেখে উদ্বুদ্ধ হন নিজেদের লেখার মান কে আরও উৎকৃষ্টতর করে তুলতে।

সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “ছবি থেকে সাহিত্য তৈরী হয়, সাহিত্য থেকে ছবি তৈরী হয়।“ তিনি বারংবার যেকোন কাজে শৃঙ্খলার উপর জোর দেন। তিনি এও বলেন যে তিনি নিজে প্রথমে একজন পাঠক হিসেবে একটি লেখা পড়েন এবং তারপর লেখকের সাথে কথা বলে তাঁর ভাবনাচিন্তার দিক ধরে একটি লেখার অলংকরণ করেন। ঠিক এই কারণেই তিনি কখনই কবিগুরু-র লেখার প্রচ্ছদ বা অলংকরণ করতে রাজি হবেন না বলে বলেন, কারণ একজন শিল্পী হিসেবে তিনি কখনোই পাঠকের কল্পনার অবমাননা করতে চান না।

অধিবেশনের অন্তিম লগ্নে এসে বহু অপেক্ষিত বিষয় ‘চিত্রগল্প’ও ছুঁয়ে যান বক্তারা। এক কথায় বলতে গেলে, আমাদের আজকের তৃতীয় অধিবেশন আমাদের শুধুমাত্র বইয়ের অলংকরণে আবদ্ধ না রেখে আরও অনেক জায়গায় নিয়ে যায়। অধিবেশনের শেষে আমরা এটুকু বলতেই পারি যে অলংকরণ শুধুমাত্র লেখাকে সমৃদ্ধ করে না, অনেক জায়গায় অলংকরণটি নিজেই একটি কাহিনী বলে দেয় আমাদের।

 

-তমোঘ্ন সরস্বতী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *