“কোথায় দাঁড়াবে তবে সামান্য কবিতা?”

প্রত্যেক প্রজন্মের মানুষকেই কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। যেমন আজকালকার ক্রিকেট প্রেমিক-দের মধ্যে চর্চার বিষয়, কোহলি না জো রুট ? ফুটবল অনুরাগী-রা অনেকদিন ধরে মেসি না রোনালদো, এই তর্কে মজে আছেন। রাজনীতির বই ঘাঁটলে বুঝতে পারবেন এখন চর্চার বিষয়, ট্রাম্প না হিলারি। এইরকম সময় সাহিত্যই বা বাদ যায় কেন। আজকের প্রজন্মের প্রায় সকলের হাতেই একটা স্মার্ট ফোন থাকে। প্রায় সবারই একটা ফেসবুক একাউন্টও আছে। তাই সাহিত্যের মেহফিল এখন মাঝেমাঝেই বসে ইন্টারনেটের ঝাড়বাতির নিচে। এই ঘটনা স্বাভাবিক ভাবেই সাহিত্যজগতকে এক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়, বই পাঠকের সংখ্যা কী কমছে ? আজ এপিজে বাংলা সাহিত্য উৎসবে “সোশাল মিডিয়া কী সাহিত্যের ক্ষতি করছে ?” প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেন এই যুগের কবিতা ব্রিগেডের সব থেকে উজ্জ্বল মুখ শ্রীজাত, আতঙ্ক উপন্যাস লিখে খ্যাতি অর্জন করা সাহিত্যিক হিমাদ্রি কিশোর দাশগুপ্ত, লেখক বিনোদ ঘোষাল ও সাংবাদিক এবং সুখ্যাত লেখক প্রচেত গুপ্ত। সঞ্চালিকা হিসেবে ছিলেন শর্মিষ্ঠা গোস্বামী চ্যাটার্জী।

আজকের অধিবেশন ডিবেটের আকার নিয়েছিল। প্রথম বক্তব্য রেখেছেন বিনোদ ঘোষাল। সোশ্যাল মিডিয়ার পেজ “বইপোকা”-র নাম নিলেন উনি। তাদের কাজ-কে “নিঃশব্দ বিপ্লব” আখ্যা দিলেন তিনি। বিনোদ ঘোষাল জানান যে তাঁর লেখার সঠিক মূল্যায়ন এখন সোশ্যাল মিডিয়াতে হয়। বিনোদ ঘোষাল জানান লেখা যে কোথাও লেখা যেতে পারে, এবং সেটাকেই আমরা সাহিত্য বলতে বাধ্য। তিনি গুহার ওপর আঁকা বাইসনের ছবির প্রসঙ্গও তোলেন। সোশ্যাল মিডিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম ব্যাট ধরেছিলেন হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত। হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত বলেছেন যে সোশ্যাল মিডিয়া লেখকের ধ্যান নষ্ট করে দিচ্ছেন। লেখক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে নজর টেনে বলেন যে সোশ্যাল মিডিয়ার লেখায় রয়ালটি পাওয়া যায়না। শ্রীজাতকে আক্রমণ করে হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত বলেন পদ্য সাহিত্যের ক্ষেত্রে যে সুবিধা সোশ্যাল মিডিয়া করে দেয়, তা গদ্য সাহিত্যের ক্ষেত্রে করে দেয় না। হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত প্রশ্ন তোলেন ফেসবুকের সাহিত্য কমিউনিটিগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে এবং চাঁচাছোলা ভাষায় দর্শকদের প্রশ্ন করেন যে সাম্প্রতিক সময় বাংলা সাহিত্যে আদৌ কোন লেখক সোশ্যাল মিডিয়া থেকে উঠে আসছেন কিনা। আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বক্তব্য শেষ করেন হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত।

“সাহিত্যের ইতিহাস ত’ আজকের নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এসেছে, আল কায়দা এসেছে, আজ আইসিস আছে। তারা সাহিত্যের কিছু করতে পারেনি। সোশ্যাল মিডিয়া আর কী করবে ?”
এই বলেই নিজের বক্তব্য শুরু করেছিলেন শ্রীজাত বন্দোপাধ্যায়। শ্রীজাত বন্দোপাধ্যায় বলেন যে তার একটি গোটা বই ফেসবুকের ওয়াল থেকে উঠে এসেছে।
শ্রীজাত জানান যে ফেসবুক তাঁকে একটা প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে তাঁকে নতুন লেখকের খুঁজে পাওয়ার। প্রতিবাদ সবসময়েই একটা মনের রিয়াকশান। সেই রিয়াকশান যদি তৎক্ষণাৎ হয়ে, তাহলে তার তাৎপর্য আলদা হয়ে। এই প্রসঙ্গে শ্রীজাত জানান, কোন আক্রোশের প্রতিবাদ এক নিমেষে পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক মাত্র উপায় সোশ্যাল মিডিয়া। তিনি কটূক্তি করে বলেন, “সিপিএমের সাংসদ যদি বিজেপীতে যোগ দেয়ে, তবে সোশ্যাল মিডিয়া কেন সাহিত্যের জায়গা হবে না।”

“আমি বইয়ের পক্ষে, প্রিন্টের পক্ষে, সাহিত্যের পক্ষে।”-প্রচেত গুপ্ত। প্রচেত গুপ্তের হাতিয়ার ছিল হাস্যরস ও ওইট। প্রচেত গুপ্ত তার নিজস্ব ভঙ্গিমায় জানান যে সোশ্যাল মিডিয়া সাহিত্যের ক্ষতি করছে না, বরং, সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতি সাহিত্য করছে। তিনি হাস্যরসের মাধ্যমে জানান যে একটা লেখা পড়ে যে সময়টা নষ্ট হয়, তা নাহলে ফেসবুকে হাজারটা লাইক পড়তো সেই সময়ের মধ্যে। শেষে বক্তব্য রাখেন উনি। তিনি ফেসবুক নিয়ে তার একটি ব্যাঙ্গাত্মক লেখা পড়ে দুর্শকদের মন জিতে নেন। একেবারে খেলার পরিভাষায় যাকে বলে “শেষ বলে ছক্কা।”

সঞ্চালিকা বিতর্কে ইতি টানেন এই বলে যে নতুন মাধ্যম-কে আমাদের মেনে নিতেই হবে। কিন্তু বিতর্ক এই মেহফিল ছেড়ে যায় না। শেষে শ্রীজাত’র লাইন ধার করেই বলতে হয়,
“কোথায় দাঁড়াবে তবে সামান্য কবিতা ?” কবিতাকে যদি এক্ষেত্রে সাহিত্যের রূপক হিসেবেই ধরি, তবে সে কোথায় স্থান পাবে-বইয়ের পাতায় নাকি ফেসবুকের পাতায়; সেইটা বিচার করার দায় পাঠকদের ওপর ছেড়ে দেওয়াই উচিত।

-অগ্নীশ কুমার দাশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *