মুখ ও সাহিত্যর ভাষা মিলে মিশে একাকার

বাংলা সাহিত্যর প্রচারের আলোকে আরও স্পষ্ট  ভাবে ফুটিয়ে তোলার অসামান্য প্রচেষ্টা এপিজে বাংলা সাহিত্য উৎসব ২০১৬। প্রথম দিনের অভূতপূর্ব সাফল্য কে এক অন্য মাত্রা দিতে, আজ ২২শে অক্টোবর, উন্মুখ ছিলেন সবাই। পত্রভারতীর কর্ণধার শ্রী ত্রিদিব কুমার চট্টোপাধ্যায়ের সঞ্চালনায় আজকের দিনের প্রথম অধিবেশনে “মুখের ভাষা কি সাহিত্যের ভাষা হওয়া উচিত?” এই বিষয়ে নিজের নিজের বক্তব্য পেশ করেন তাবড় তাবড় সাহিত্যিকরা। সাধু ভাষা কীভাবে “লুপ্ত”হয়ে আসছে সেটা ত্রিদিব কুমার চট্টোপাধ্যায় তুলে ধরেন। এই অধিবেশনে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঐতিহাসিক তথা সাহিত্যিক ডঃ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী; দুই বার আনন্দ পুরস্কার, সাহিত্য একাডেমী, ও বঙ্গ বিভূষণ পুরস্কার প্রাপ্ত, সকলের প্রিয় শ্রী শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও সাম্প্রতিককালের অন্যতম জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক শ্রী রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়।

নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী বললেন “সব তৎসম শব্দ ডিকশানারি থেকে বাদ দাও, যা পড়ে থাকবে তা হয়ত সাহিত্য নয়”। একের পর এক শব্দের উদাহরণ দিয়ে তিনি এটা দৃষ্টিগোচর করলেন কি ভাবে এই শব্দগুলো সাহিত্যে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন। নিজের প্রভূত সংস্কৃত জ্ঞান দিয়ে তিনি দর্শকদের মুগ্ধ করলেন। পরে আর এক বার যখন তাকে বলতে বলা হয়, তিনি বলেন যে যদি তিনি চলিত ভাষায় লিখতেন, তাহলে তাঁকে আজ ডাকা হতো না।

এরপর নিজের বক্তব্য রাখলেন শ্রী শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।  দর্শকদের নিজের শুভেচ্ছা জানিয়ে কথা শুরু করে তিনি বলেন ,”লেখক যে ভাষাতে লিখতে পছন্দ করেন তাকে সেই ভাষাতে লিখতে দেওয়া উচিত।” এমন অনেক লেখক আছেন যারা শব্দের ব্যাবহার নিয়ে ততটা ভাবেন না, তাদের সেটা থেকে তাদের বিরত থাকতে অনুরোধ করলেন শীর্ষেন্দু বাবু। সকলকে অবাক করে দিয়ে তিনি বলেন যে “ইংরাজি ভাষা সব থেকে বড় চোর ভাষা”। সঞ্চালক মহাশয় অপভাষার ব্যাবহার নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করাতে তিনি বলেন তিনি এই ধরনের ভাষার ঘোর বিরোধী, অবশ্য কিছু কিছু লেখক এমন আছেন যারা এই অপভাষা ব্যবহার সত্ত্বেও তাদের লেখা ভীষণই সুপাঠ্য। পাঠকদের কথা তিনি ভেবে দেখেননা, এটাও তিনি বলেন।

ত্রিদিব কুমার চট্টোপাধ্যায় রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় কে শুধোন যে সাহিত্যে সাধু ভাষার কী প্রয়োজন। এর উত্তরে  উনি বলেন যে “আমি কে বলে দেওয়ার যে সাহিত্যেের ভাষা কী হবে?” দর্শকরা এই মন্তব্য শুনে করতালি দিয়ে সারা অক্সফোর্ড বুকস্টোর ভরিয়ে দেন। সাহিত্যে ভাষার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি টি.এস.এলিয়েটের এক কবিতার এক অংশ পড়ে শোনালেন। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সাথে তালে তাল মিলিয়ে তিনি বলেন যে ভাষার ব্যবহার নির্ভর করবে তিনি কী লিখছেন, কার জন্য লিখছেন, কেন লিখছেন, এই সবকিছুর উপর। সবসময় যে লেখকরা নিজেদের ভাষাতেই বলবেন তা নয়। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে নিজের এক বইয়ে ইংরাজি ভাষাকে সমস্ত অলঙ্করণ থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে হয়ত বিফল হয়েছিলেন। হেমিংওয়ের “দ্য ওল্ড ম্যান এ্যন্ড দ্য সি’ প্রায় ভাষার অলঙ্কারহীন বলে তিনি মনে করেন।

বহু কাল ধরে বাংলা সাহিত্যে সাধু-চলিতের একটা ভাগ ছিল, যেটা এখন প্রায় নেই বললেই চলে। কলমের ভাষা এবং মুখের ভাষার মধ্যে ফারাকটা বোধহয় প্রথম শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝতে পেরেছিলেন যখন তিনি ব্যোমকেশের শেষের দিনের উপন্যাসগুলো সাধু ভাষা না লিখে চলিত ভাষায় লিখেছিলেন। এই প্রশ্ন দর্শকদের মধ্যে এক জন করলে পরে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় তার সাথে সহমত হন।

– অরিত্র বসু