রহস্য, রোমাঞ্চ, গোয়েন্দা এবং আরও অনেক কিছু

day2_session3

বাঙ্গালী চিরকালই এক অত্যন্ত সাদামাটা, শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে পরিচিত। জীবনের কোনও দিকেই আমরা কখনোই বিশেষ ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নই। এখানে বলে রাখা ভাল যে এহেন অপবাদ বাঙ্গালীর ওপর পড়লেও সারা বিশ্বের বেশীরভাগ মানুষই এই জীবনদর্শনে বিশ্বাসী। এবং সেখান থেকেই বোধহয় আমাদের জীবনের অপূর্ণ সাধ মেটানোর জন্য রহস্য, রোমাঞ্চ ও গোয়েন্দা কাহিনী-র প্রতি ভালবাসার উৎস। একথা বলে অবশ্যই আমি আমাদের হৃদমাঝারে জায়গা করে নেওয়া গোয়েন্দা কাহিনীকারদের অবদান ছোট করার ধৃষ্টতা দেখাব না। একইসাথে গতকালের প্রথম অধিবেশনে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের কথার রেশ ধরে এটা বলার লোভ ছাড়তে পারছি না যে খানিকটা হলেও হয়তো উক্ত কারণে উঠতি লেখকরা নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার জন্য এই পথটি বেছে নেন, মনে করেন আট থেকে আশি, সবার মনের চাবিকাঠি ওই রহস্য-রোমাঞ্চ-গোয়েন্দা নামক জাদুদণ্ডের কাছে আছে।    এই নিয়েই এপিজে বাংলা সাহিত্য উৎসবের দ্বিতীয় দিনের তৃতীয় অধিবেশন – “ রহস্য-রোমাঞ্চ-গোয়েন্দা লিখলেই জনপ্রিয়।” আলোচনায় আমাদের সাথে ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী ও কল্পবিজ্ঞান লেখক অনীশ দেব, পেশাগত ভাবে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে তাঁর কলম নিয়ে নীরব প্রতিবাদী লেখক কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়, পত্রভারতীর কর্ণধার ত্রিদিব কুমার চট্টোপাধ্যায় এবং বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী নচিকেতা চক্রবর্তী। সঞ্চালনার দায়িত্ব সামলালেন আধুনিক বাংলা সাহিত্য জগতের পরিচিত মুখ প্রচেত গুপ্ত।

 

dsc_0794

 

আলোচনার শুরুতেই সঞ্চালক মহাশয় এটা পরিষ্কার করে দিলেন যে আমরা সবাই রহস্য কাহিনী পড়তে ভালবাসি। অধিবেশন শুরু হল কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়-কে দিয়ে যে তিনি রহস্য-রোমাঞ্চ লেখার দিকে কী করে এলেন, এবং কেন? উত্তরে শ্রী মুখোপাধ্যায় বলেন যে সেই পাঠক কী “খাবে” সেই আদি-অনন্ত প্রশ্নটি এসেই যায়, এবং সেই কারণে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েও তাঁকে হয়তো অনেক সময় রহস্য-রোমাঞ্চ লিখতে হয়। ত্রিদিববাবুও এ বিষয়ে একমত হয়ে বলেন যে যদিও তাঁর নিজের রহস্যগল্প লেখা শুরু হয় খানিক সহজে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আশায়, এখন অনেক সময়ই তাঁকে পাঠকদের চাপে পড়ে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েও অন্য বিষয়ে লেখা থেকে বিরত থাকতে হয়। আমাদের সরস সঞ্চালক এবার প্রশ্নের তীর ছোঁড়েন অনীশ দেবের দিকে। প্রশ্ন, তাঁর রহস্য-রোমাঞ্চে সাফল্যের রহস্য কী? অনীশবাবু উত্তরে বলেন যে তাঁর নিজের ছোটবেলায় বেছে বেছে রহস্য-রোমাঞ্চ-গোয়েন্দা গল্পই পড়তেন এবং সেই ভালবাসা থেকেই তাঁর এই জগতে প্রবেশ। অধিবেশন অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে অনীশবাবু সাহিত্য জগতে গোয়েন্দাদের বিবর্তন নিয়ে কথা বলেন।  নচিকেতা চক্রবর্তী তাঁর স্বভাবসিদ্ধ কায়দায় বলেন যে তিনি এক লাইনে জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যকে ছুঁয়ে যেতে চান – “সে প্রথম প্রেম আমার, নীলাঞ্জনা।” প্রেমরহস্য বিষয়ে নচিকেতা বলেন, “প্রেম প্রাপ্তিতে নেই, অপ্রাপ্তিতে প্রেম আছে।”

হাসি, ঠাট্টা ও খুনসুটি নিয়ে এগিয়ে চলতে থাকে এই দ্বিতীয় দিনের তৃতীয় অধিবেশন। প্রকাশক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় যখন অনীশ দেবকে মজার ছলে তাঁর “ল্যাধ” নিয়ে আক্রমণ করেন, তখন তিনি বলেন যে তাঁর উপন্যাস ‘তেইশ ঘণ্টা সাত মিনিট’টি তিনি দশ বছর ধরে লেখেন। তিনি কীভাবে এমন অদ্ভুত এবং অন্য রকমের ভূতের গল্প লেখেন, এই প্রশ্নের উত্তরে অনীশ দেব বলেন যে যখনই তাঁর মাথায় গল্পের ‘সিকোয়েন্স’ আসে, তখনই তিনি সেটি ছোট করে হলেও লিখে রেখে দেন এবং পরে তার উপর সম্প্রসারণ করেন। তিনি বলেন যে “ভিস্যুয়াল আসা বন্ধ হয়ে গেলে আমার লেখাও থমকে যাবে।”

 

সাহিত্যিক কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন যে যেকোন রহস্য কাহিনীর মূল কাঠামোটি এক থাকলেও প্রত্যেকটি গল্পের চরিত্র আলাদা এবং তাদেরকে “দাঁড়” করানো মোটেই সহজ কাজ নয়। তার সাথে সাথে তিনি এও বলেন যে “ কোনও ক্যারেকটারকে সাসটেইন করাতে সময়ের দরকার হয়।” তাঁর এই বক্তব্যের খানিক প্রতিবাদ করে ত্রিদিববাবু বলেন যে রহস্য গল্পের কাঠামো সবসময় পূর্বাবধি ঠিক করা থাকে না এবং এমন অনেক রহস্যকাহিনী আছে যাদের কোনও ‘ডেফিনিট স্ট্রাকচার” নেই।  কথায় কথায় বব ডিল্যানের সদ্য নোবেলপ্রাপ্তি নিয়ে নচিকেতা এক শ্রোতার প্রশ্নের উত্তরে বলেন যে খানিকটা হলেও তাঁর এই স্বীকৃতি গীতিকারদের সাহিত্যজগতে তাদের প্রাপ্য সম্মান পেতে সাহায্য করবে। অধিবেশন শেষে আমি নিজে এটুকু কথা মাথায় রেখে বাড়ি ফিরব যে রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনী লেখায় অনেকেই সহজে পরিচিতি পাওয়ার জন্য আসলেও সে জগতেও প্রতিষ্ঠা পাওয়া মুখের কথা নয়।

– তমোঘ্ন সরস্বতী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *