ড্রামারের ড্রামায় বহিপীর

গত ২৯শে নভেম্বর গিরীশ মঞ্চে ড্রামার নাট্যগোষ্ঠীর দ্বারা অভিনীত হল প্রখ্যাত বাংলাদেশী সাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ্ রচিত বহিপীর । নাটকের বিষয়, খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমাদের এই পুরুষ শাসিত সমাজে নারীদের ওপর অন্যায় অত্যাচারের প্রতিবাদ।

013

নাটকটিতে রচয়িতা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মানুষের মনের বিভিন্ন আঙ্গিক তুলে ধরেছেন। নাটকের স্থান, একটি বজরা। নাটকটি শুরু হচ্ছে জমিদার হাতেম আলির স্ত্রী খোদেজা বিবি, তাঁর পুত্র হাশেম আলি ও একটি বিপর্যস্ত সপ্তদশী মেয়ে তাহেরার কথোপকথন দিয়ে, হাতেম আলির বজরার এক কামরায়। কথোপকথন থেকে এটুকু স্পষ্ট যে তাহেরার বাবা ও তার সৎমা তাকে এক প্রকার জোর করেই এক বৃদ্ধ পীরের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তাহেরা সেখান থেকে এক চাচাতো ভাইয়ের সাথে পালিয়ে এসে শেষমেষ এই বজরায় স্থান পায়। জমিদারপত্নী শুরু থেকেই তাহেরাকে তার এই বোকামির জন্য বকাবকি করলেও কলেজ পাশ করা হাশেমের মত অবশ্য আলাদা, তার মত একজন মহিলার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে কখনোই তার বিয়ে দেওয়া উচিত না। এহেন মতবিরোধের মধ্যেও একটা বিষয়ে মাছেলে দুজনেই একমত, যে অসহায় মেয়েটি যখন তাদের কাছে এসেই পড়েছে, তখন তার দেখভাল করাটা তাদের দায়িত্ব।

019

অন্যদিকে দেখা যায় যে আগের রাতে ঝড়ের সময় জমিদারের বজরার সাথে টক্কর লেগে নৌকা আধডোবা হয়ে যাবার পর এক পীরবাবা – বহিপীর ও তার সঙ্গী হকিকুল্লাহ্ সেই বজরাতেই ঠাঁই পান। ঘটনাচক্রে জানা যায় যে বহিপীরই হলেন তাহেরার স্বামী, যার মুখ সে কখনো দেখার আগেই পলায়ন করে। পীরসাহেব জমিদারের কাছ থেকে তাঁর যাত্রার আসল উদ্দেশ্য লুকিয়ে রেখে তাঁর সঙ্গী কে পাঠান তাহেরা বিবির খোঁজ করতে। হকিকুল্লাহ্ ফিরে এসে খবর দেয় যে তাহেরা বিবি সেই বজরাতেই বাস করছে। অপর দিকে জমিদারসাহেবও ডাক্তার দেখানোর নাম করে বজরা থেকে বেরিয়ে ঘুরে আসেন এক বিষন্ন বদন নিয়ে, এসে জানান যে তাঁর যাত্রার মূল উদ্দেশ্য ছিল তাঁর জমিদারীকে নিলামে ওঠা থেকে রক্ষা করার, কিন্তু তা করতে তিনি সক্ষম হননি। ইতিমধ্যে পীরসাহেব বড়ই উতলা হয়ে পড়েছেন তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। জমিদারবাবু ফেরার সাথে সাথে তিনি কথাটি পাড়লেন এবং তারপর থেকে বিভিন্ন উপায়ে, প্রথমে মিষ্ট কথায় ও পরে কড়া শাসানি দিয়ে তাঁকে নিয়ে যেতে চান। কিন্তু তাহেরা এক অত্যন্ত সাহসী মেয়ে, সে কিছুতেই ফিরে যাবে না, দরকার হলে সে আত্মহত্যা করতেও রাজি। তাহেরার এই চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখে আবার হাশেম তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।

শেষমেষ কোনও উপায় না দেখে পীরসাহেব জমিদার কে তার জমিদারী বাঁচানোর জন্য পর্যাপ্ত টাকা দেওয়ার প্রস্তাবও দেন, তাঁর বিবিকে ফিরে পাওয়ার বিনিময়ে। কিন্তু তাঁর এহেন পরোপকারী মনোভাবের পেছনের আসলে তাহেরার দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর অভিসন্ধি যখন বুঝতে পারলেন জমিদারসাহেব, তখন তিনি বেঁকে বসলেন। নাটক শেষ হয় মানবিকতার জয়ের বার্তা দিয়ে। পীরসাহেব হাশেম ও তাহেরার ভালবাসা কে মেনে নেন।

006

প্রত্যেক অভিনেতাঅভিনেত্রীই নিজেদের চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন, এবং যথেষ্ট সফল হয়েছেন তাদের এই প্রচেষ্টায়। হাশেমের চরিত্রে শঙ্কর চন্দ বেশ নজর কেড়েছেন তাঁর সাবলীল অভিনয়ের দ্বারা। বহিপীরের চরিত্রে নিহারেন্দু ব্যানার্জী, তাহেরার চরিত্রে বিয়াস সাহা ও হকিকুল্লাহ্র চরিত্রে রাজু সরদারও তাদের চরিত্রের প্রতি সুবিচার করেন। এনাদের পাশে খুব সামান্য হলেও খোদেজার চরিত্রে অনন্যা ঘোষ ও হাতেম আলির চরিত্রে বিশ্বজিত চক্রবর্তীকে ম্রিয়মান লাগল।

মঞ্চ পরিকল্পনাতেও বেশ খানিক উন্নতি করার জায়গা আছে। নির্দেশনায় সুকুমার চক্রবর্তী, আবহে উপমন্যু দাস ও আলোতে তপন ভট্টাচার্য যথেষ্ট ভাল কাজের নিদর্শন রেখে গেছেন।

তবে, সব শেষে আমি বলব যে প্রত্যেকটি নাটক আলাদা আলাদা মানুষের মনে আলাদা আলাদা ছাপ ফেলে, তাই শুধুমাত্র এই লেখাটি পড়ে প্রভাবিত হয়ে না পড়ে নিজেরা এসে প্রত্যক্ষ করে যান। আগামী ৪ঠা ফেব্রুয়ারি নাটকটি মঞ্চস্থ হতে চলেছে সল্ট লেকের বি.ডি. হলে। দুঘণ্টায় এক অত্যন্ত যুগোপযোগী মর্মস্পর্শী কাহিনী ও তার উপযুক্ত অভিনয় অপেক্ষা করে আছে আপনাদের জন্য।